close


(বাংলাদেশ প্রতিদিন)

 প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ টা আপলোড : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:৫৮

 

 

বিয়ে মানবের দ্বিতীয় জীবন

 

- বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

 

 

বিপ্লবী কবি কাজী নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালের দড়িরামপুর থেকে আনন্দভরা মন নিয়ে সখীপুরের পথে ছিলাম। ত্রিশাল ছাড়ার আগে রশিদ চেয়ারম্যানের ভাই দলীয় অসুস্থ কর্মী ওয়াহাব মিঞাকে দেখতে গিয়েছিলাম। বিশাল বিত্তের মালিক তারা। চার ভাইয়ের রাজপ্রাসাদের মতো চমৎকার বাড়িঘর। কিন্তু দেখার কেউ নেই। বউ গেছেন কানাডায় মেয়ের কাছে, ওয়াহাব মিঞা একা। অন্য ভাইদেরও একই অবস্থা। ভাবতে ভাবতে আসছিলাম। শরীরটা তেমন ভালো ছিল না। নজরুল একাডেমিতে নরম বিছানার কারণে রাতে ঘুম হয়নি। তাই শরীর ম্যাজম্যাজ করছিল। সখীপুর ফিরে বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীদের সঙ্গে দু-চার কথা বলে বেশ হাসিখুশি টাঙ্গাইলের পথ ধরেছিলাম। হঠাৎই স্ত্রীর ফোনে সব এলোমেলো হয়ে যায়। আমাদের বড় দুলাভাই এ কে এম শহীদুল হক তখনই মারা গেছেন। তার শরীর খারাপের কথা খুব একটা শুনিনি। বয়স হয়েছিল ৮০-৮২ বছর। কাউকে তেমন কষ্ট দিতেন না। কিছু মানুষ থাকে চিররোগী, আবার কিছু মানুষ পরম আমুদে, অন্যকে বিব্রত করেন না, কষ্ট দেন না, মহানন্দে ভরিয়ে রাখেন। এ কে এম শহীদুল হক ছিলেন তেমনই একজন। ৮-১০ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। সবাইকে রসুনের কোয়ার মতো বেঁধে রাখতেন। টাঙ্গাইল গিয়ে যখন তার প্রাণহীন মুখ দেখছিলাম মৃত বলে মনে হয়নি। মনে হচ্ছিল নিত্যদিনের মতো শুয়ে আছেন। ইমু শিয়রে বসে আকুল হয়ে কাঁদছিল। যাওয়ার সময় হয়তো সবাই কাঁদে। মৃত্যু আর কান্না এক সুতোয় বাঁধা। তীব্র শীতের মধ্যে রাত ৯টায় বিবেকানন্দ স্কুলমাঠে নামাজে জানাজা হয়েছে। একজন মানুষের জন্য কতটা আকর্ষণ থাকলে তার প্রায় সব ভাইবোনসহ উল্লেখ করার মতো প্রচুর লোক হাজির হয় জানাজা নামাজে তার প্রমাণ তিনি। জানাজা নামাজ শেষে যখন লাশ গোরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তখন কেন যেন বার বার মনে হচ্ছিল সবার জন্যই এই শেষ যাত্রা।



মেয়েটা ২ তারিখ লন্ডনে যাবে তাই ৩০ জানুয়ারি ঢাকা ফিরেছিলাম। ভালো লাগছিল না। একজন মানুষ যিনি সারা জীবন হাসিখুশি চলেছেন। নাসরীনের সঙ্গে আমার বিয়ে নিয়ে কত কিছু হয়েছে। বীরউত্তম জিয়াউর রহমানের আমলে শাহ আজিজ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করায় স্বাধীনতার পর দালাল আইনে বন্দী। ৭২-এর ফেব্রুয়ারি বা মার্চের ঘটনা। যে বাড়িতে শাহ আজিজুর রহমান ভাড়া থাকতেন সেই বাড়িতে আমি আর কে এম ওবায়দুর রহমান গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তার পরিবারকে আশ্বস্ত করতে। প্রতি মাসে বাড়িভাড়া ও মাসোয়ারা পৌঁছে দিয়ে আসতাম। কখনো বঙ্গবন্ধু দিতেন, কখনো লজ্জায় তাকে কিছু না বলে নিজেই দিয়ে আসতাম। মাঝে মাঝে নেতা ও পিতা জিজ্ঞাসা করতেন, আজিজ ভাইয়ের বাড়িতে নিয়মিত টাকাপয়সা পৌঁছে দিস তো? তাকে জি বা হ্যাঁ ছাড়া কিছু বলা জানতাম না। তাই বলতাম। কী ভাগ্য! সেই শাহ আজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকতে আমার সঙ্গে যার বিয়ের কথা সেই নাসরীনের পাসপোর্ট সিজ করা হয়েছিল। একবারও ভাবেননি স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পর্যন্ত আমি তাদের প্রতি মাসে বাড়িভাড়া ও মাসোয়ারা দিয়ে এসেছি। যে আগস্টে বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন সেই আগস্টের ২ বা ৩ তারিখেও টাকা দিয়ে এসেছিলাম। অথচ আমার স্ত্রীর পাসপোর্ট সিজ করতে তিনি তার দুর্দিনের কথা একবারও ভাবেননি। এটাই জীবন, এটাই সমাজ। ঘটনাটি ঘটেছিল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর অল্প কিছু দিন আগে। যে কারণে নাসরীনের সঙ্গে বিয়ে চার বছর পিছিয়ে যায়। আদৌ বিয়ে হতো কিনা জানি না। সংসার বাঁধা যেত কিনা জানি না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের বিয়ে হয়েছে, ছেলেমেয়ে এসেছে। বলতে গেলে ভালোই আছি। বিশেষ করে কুশিমণি আলো করে ঘরে এসে আমার সংসারের সমস্ত গ্লানি, দুঃখ-বেদনা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিয়েছে। আর এই জীবন বা সংসার গঠনে এ কে এম শহীদুল হকের ছিল বেশ বড় ভূমিকা। ভদ্রলোক আমাকে ভালোবাসতেন, আদরযত্ন-সম্মান করতেন। কারণ স্বাধীনতা আমায় বদলে দিয়েছে, স্বাধীনতা আমায় কক্ষচ্যুত করেছে, স্বাধীনতা আমায় দেশ ও দেশবাসীকে চিনতে জানতে বুঝতে শিখিয়েছে। মানুষ জন্মে, জন্মের পরে মারা যায় এটা চিরন্তন নিয়ম। সব জীবকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু এই স্বল্প জীবনে জন্ম-মৃত্যুর মাঝে মানুষের জন্য স্রষ্টার সৃষ্টির জন্য যে কোনো দায়িত্ব আছে তা খুব একটা বুঝতাম না, যদি না স্বাধীনতা পেতাম। দেশের জন্য মানুষের জন্য কতটা কী করেছি বা করতে পেরেছি কখনো ভালোভাবে হিসাব মেলাতে পারিনি। কিন্তু বাড়িঘর ও স্কুল পালানো বাঁধনহারা মানুষকে সাধারণ মানুষ এত ভালোবাসতে পারে, দোয়া করতে পারে, দেশ তার একজন সেবককে এত সম্মান-মর্যাদা দিতে পারে আমার জানা ছিল না। আমার জীবনে স্বাধীনতা যেমন ছাপ ফেলেছে, সংসার জীবনে শহীদুল হকের ভূমিকা তেমন। মানব জীবনে জন্ম-মৃত্যুর মাঝে বিয়ে। ছেলেবেলায় আমার কাছে বিয়ের তেমন গুরুত্ব ছিল না। স্বাধীনতার পর প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততার মাঝে কার বিয়েতে যেন বঙ্গবন্ধুকে দেখেছিলাম। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি এই বিয়েতে? তিনি আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলেছিলেন, কাদের! বিয়ে কোনো যেনতেন ব্যাপার নয়। বিয়ে একটা মারাত্মক জিনিস। মানুষের জন্মের পরে বিয়ে নবজন্ম। জানিস, ভালো বিয়ে না হলে রাজপুত্রও ফকির-মিসকিনের চেয়ে অধম হয় আবার অনেক কাঙ্গাল বিয়ে করে রাজ্যের সুখ-আনন্দ-ধন সবকিছু পায়। কথাটি ইন্দিরা গান্ধীর কাছেও শুনেছিলাম। তাই মানব জীবনে বিয়ে যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এখন তিলে তিলে তা উপলব্ধি করি। সেজন্য শহীদুল হকের মৃত্যু আমাদের বেশ নাড়া দিয়েছে। ২ তারিখ আমার বড় মেয়ে কুঁড়ি লন্ডনে গেছে। ছেলেমেয়েরা টাঙ্গাইলে গিয়েছিল শহীদুল হকের কুলখানিতে। এয়ারপোর্ট থেকে কুঁড়ি যখন লন্ডনের পথে আর দীপ-কুশি, ওদের মা টাঙ্গাইল চলে গেল তখন বুকটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। বাড়িতে এসে কিছুই ভালো লাগছিল না। শুয়েবসে টেলিভিশন দেখে কোনো কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। এদিক-ওদিক যেদিকেই যাচ্ছিলাম বুকটা হু হু করছিল। একে তো একজন মানুষের মৃত্যু ব্যথাতুর করে রেখেছিল, তার ওপর সন্তান-সন্ততি সবাই একত্রে বাইরে যাওয়ায় কেমন যেন একটা শূন্যতা চেপে বসেছিল। ছেলেমেয়েদের জন্য এতটা অভাব খুব একটা বুঝতে পারিনি। সবাইকে ছেড়ে দূরে খুব একটা বেশি যাই না, ফোনে সবসময় যোগাযোগ থাকে। তার পরও এখানে ওখানে গেলে বাচ্চাদের মুখ দেখার ইচ্ছা হলেই ছুটে আসি। সকালে টাঙ্গাইল থেকে নাটোরে গিয়ে গভীর রাতে ঢাকায় ফেরা আমার কাছে কোনো নতুন কিছু নয়। সে তো হয় আমি বাইরে গেলে। কিন্তু আমি বাড়িতে অথচ ছেলেমেয়ে কেউ নেই এ যেন এক অসহ্য যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণাই ভোগ করেছি সেদিন।

 

NEXT >