close


 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জিয়াউর রহমানকে নিয়ে মন্তব্য আমাকে নাড়া দিয়েছে। বঞ্চনা-বৈষম্য পাকিস্তানিরা যেমন করেছে, বাংলাদেশের শুরু থেকে মুক্তিযোদ্ধারা তেমনি হয়েছে। তবু জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলি চালিয়েছেন এ কথা মেনে নেওয়া যায় না। ইতিহাসে এর কোনো প্রমাণ নেই। আর প্রমাণ না পাওয়া গেলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা অসত্য হবে। আমার কাছে প্রধানমন্ত্রী বড় কথা নয়। আমি কখনো শক্তির পূজারি ছিলাম না, আমি ভালোবাসা-অন্তরাত্মা এবং আন্তরিকতার পূজারি ছিলাম। অনেক পণ্ডিত বলেন, ৭ মার্চেই সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা করা উচিত ছিল। তা করলে বাঙালি সেনারা বাদবাকি পাকিস্তানিকে বন্দী-টন্দী করে দেশ স্বাধীন করে ফেলত। এত রক্তের প্রয়োজন হতো না। এ যেন ছেলের হাতের মোয়া। ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা ঘোষণার আর তেমন কিছু বাকি ছিল না। ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদাররা হত্যাযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে পাকিস্তানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তেমন কেউ প্রত্যক্ষ সংগ্রামে যোগ দেয়নি, বেঙ্গল রেজিমেন্টেরও তেমন কেউ নয়। ২৫ মার্চের দু-তিন দিন আগে বিডিআরের উইং কমান্ডার মেজর রফিক অবশ্য কিছুটা ছোটাছুটি করেছেন। অন্যদিকে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট যাতে বিদ্রোহ করতে না পারে সেজন্য নানা স্থানে ভাগ-বাটোয়ারা করে রেখেছিল। যে কারণে মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল এবং ময়মনসিংহে আগে থেকেই বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিনটি কোম্পানি ছিল। তাদের ১০-১৫ জন সাধারণ সৈন্য ১৪ মার্চ জয়দেবপুর আসার পথে কোনাবাড়ী থেকে জয়দেবপুরের মাঝামাঝি হাজার হাজার মানুষের বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা, পিন্ডি, না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে গাড়ি ফেলে জনতার সঙ্গে মিশে যায়। তারাই ১৪ তারিখ থেকে জনতাকে অস্ত্র চালনা শেখাতে থাকে। যারা সবকিছু ফেলে সাধারণ মানুষের পাশে যাওয়ার আগে দাঁড়িয়েছিল আমরা তাদের কারও নাম-ঠিকানা জানি না। তাদের বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দিলে সেটাও কম হতো। কিন্তু কোথাও তারা নেই। সব নাম আমাদের। সফিউল্যাহ, জিয়া, খালেদ মোশাররফ, শাফায়েত জামিল আমরাই বীর-মহাবীর। হ্যাঁ, এটা বলা যায় ১৯ মার্চ ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবারের নেতৃত্বে জয়দেবপুরের সৈন্যদের অস্ত্রহীন করতে গেলে অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার তার লোকজন নিয়ে ঢাকা ফেরার পথে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও হাজার হাজার জনসাধারণ তাদের আটকে রেখেছিল। তখন জাহানজেব আরবার মেজর সফিউল্যাহকে ঘেরাওমুক্ত করতে নির্দেশ দেয়। মেজর সফিউল্যাহর নির্দেশে রাস্তা ফাঁকা করতে কিছু সৈন্য তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গুলি চালিয়েছিল। কিছু সৈন্য গুলি চালাতে অস্বীকার করেছিল। হতাহতও হয়েছিল বেশ কয়েকজন। যদি পাকিস্তান থাকত, আমরা যদি সফলকাম না হতাম তাহলে ব্রি. জাহানজেব আরবারের হুকুম মানার জন্য সফিউল্যাহর অবশ্যই প্রমোশন হতো। কিন্তু যে সৈন্যরা ময়মনসিংহের দিক থেকে আসতে গিয়ে জনতার মিছিলে মিশে গিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, ১৯ তারিখ মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যারা যায়নি তাদের কী হতো ফাঁসি। ২৫ মার্চ চট্টগ্রাম জেটিতে জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে জিয়াউর রহমান অবশ্যই যাচ্ছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট কোথাও কোনো গুলি চালায়নি, চালিয়েছে পাকিস্তানি অবাঙালিরা। কর্নেল অলি আহমদ পাগলের মতো ছুটে গিয়ে টাইগার পাসের কাছে জিয়াউর রহমানের গাড়ির যদি গতিরোধ করতে না পারতেন তাহলে হয়তো ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। যদি তিনি জেটিতে যেতেন, হয়তো অস্ত্র নামাতেন, বীর বাঙালি বাধা দেওয়ায় গুলি চালাতেন তাতে হয়তো মানুষ মরত। কিন্তু তা তো হয়নি। কারণ তিনি যেতে পারেননি। এর পরের ইতিহাস সবার জানা, কালুরঘাট বেতারে জনাব জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের ঘোষণা জাতিকে উদ্বেলিত করেছিল, মুক্তিযুদ্ধে প্রভাব ফেলেছিল। স্বাধীনতার পর গণভবনে জিয়াউর রহমানকে পাশে নিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে গিয়ে এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র ও জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনেছেন। কত প্রশংসা করেছেন। সবই তো তাহলে মাঠে মারা যায়। বিএনপির নেতা-কর্মী ও কিছু পণ্ডিত যখন বলেন জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক, তার ঘোষণায় যুদ্ধ করেছি। তখন আমরা অনেকেই মেনে নিতে পারি না, ইতিহাস বিকৃতি মনে করি। ইদানীং ইংরেজিতে পারদর্শী বাঙালি এত বোঝে I, Major Zia, do hereby declare the independence of Bangladesh on behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman! কণ্ঠ ছিল জিয়ার প্রাণ বঙ্গবন্ধু এটা বোঝেন। আশ্চর্য ব্যাপার! তখন কাদের সিদ্দিকী ছিল না, জিয়াউর রহমানও না, সফিউল্যাহ-খালেদ মোশাররফ কেউ কিছু না। আকাশে-বাতাসে সাগরে-নদীতে তখন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জিয়াউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান, রহমানে রহমানে মিল থাকলেও দুই রহমান এক নয়। এখন যেমন আওয়ামী লীগের সবকিছুতে জননেত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপিতে খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টিতে এরশাদ, ঠিক তখন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখন নেতা-নেত্রীদের প্রতি জনগণের তেমন আস্থা না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি এই ভূখণ্ডের আকাশ-বাতাস-তরুলতা-মানুষজন-পশুপাখি সবার ছিল এক নিঃস্বার্থ সমর্থন। বীরউত্তম জিয়াউর রহমানের ঘোষণায়ই যদি যুদ্ধ হতো তাহলে কেন মুজিবনগর সরকার হবে? জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব থাকলে জিয়ানগর সরকার হওয়া উচিত ছিল। কেন তিনি একটি সাধারণ সেক্টর কমান্ডার হবেন? মুক্তিবাহিনীর প্রধান হলেন না, বিপ্লবী সরকারের প্রধান হলেন না তার কথায় আমরা যুদ্ধ করলাম স্বাধীন করলাম এ কি হয়? নিশ্চয় তিনি এখন একজন মস্তবড় নেতা। কিন্তু তখন তিনি আমাদের ছায়া ছিলেন। তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন কিংবা যুবনেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, জননেতা আবদুর রাজ্জাকের সমসাময়িকও ছিলেন না, অনেক পেছনে ছিলেন। আমরা সবাই ছিলাম বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ছায়া, কায়া হওয়া তো দূরের কথা। আর জিয়াউর রহমান তখন আমাদের চেয়ে অনেক দূরের ছায়া ছিলেন। তাই বলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় তিনি জনতার ওপর গুলি চালিয়েছেন এ কথা সত্য নয়। এতে ইতিহাস বিকৃতি হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে বলিয়ে দুষ্ট লোকেরা তাকে ছোট করার বা অপ্রিয় করার চেষ্টা করছে। সত্যিই যদি তার শুরুর ভূমিকা অমন হতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার নামের অক্ষর দিয়ে কেন ব্রিগেড করা হয়েছিল? যে তিনটি ব্রিগেড করা হয়, কে, এস, জেড ফোর্স। জেড ইংরেজি বর্ণমালার শেষ অক্ষর হলেও জিয়াউর রহমানের নামানুসারে জেড ফোর্স করা হয়েছিল সবার আগে। তাকে সেক্টর কমান্ডার করেছিল কে বা কারা? করেছিল বাংলাদেশ বিপ্লবী সরকার। সরকার পরিচালনায় বীরউত্তম জিয়ার কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু যখন অবিসংবাদিত নেতা, সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তখন ৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের যে বীরত্বসূচক খেতাব দেওয়া হয়। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ, সবাই সশস্ত্র বাহিনীর। ৬৮ জন বীরউত্তমের আমি ছাড়া সবাই সশস্ত্র বাহিনীর। ১৭৫ জন বীরবিক্রম, তাদের ১০-১২ জন বাদে সব সেনা-বিমান-নৌ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ৪২৬ জন বীরপ্রতীকের ২০-২২ জন সাধারণ কৃষক-শ্রমিক ছাত্র-জনতা। জিয়াউর রহমানকে যে বীরউত্তম দেওয়া হয়েছে তাও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে। যে সরকারে জিয়াউর রহমানের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। তাহলে গণবিরোধী এ রকম একজন লোককে যুদ্ধকালীন বিপ্লবী সরকার থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্থায়ী সরকার তাকে অত অত স্বীকৃতি দিল সেসব সরকার কি অন্ধ, অচল, ব্যর্থ ছিল? ইতিহাস তো অন্য কথা বলে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীনের নেতৃত্বের সরকার পৃথিবীতে এক সফল যুদ্ধকালীন সরকার। যারা নিরস্ত্র সংগ্রামকে সশস্ত্র যুদ্ধের রূপ দিয়ে সফলতা এনেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সম্মানের সঙ্গে আমাদের সম্মান জড়িত। আপনি ভালো করলে আমাদের ভালো হয়, আপনার খারাপে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হই। ওইসব কথা তো এতদিন বলেননি, তাই বিবেকের তাড়নায় কথাগুলো বললাম। কিছু মনে করবেন না। শুনেছিলাম, পড়েছিলাম, কথাই কর্তৃত্ব করে, কথাই নেতৃত্ব করে। কথাগুলো বোধহয় মিথ্যা নয়।

লেখক : রাজনীতিক।
 

< PREVIOUS