close


(বাংলাদেশ প্রতিদিন)

  প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ মার্চ, ২০১৮ ২৩:১১

 

 

আমার কথা অমন ছিল না

 

- বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

 

 

লিখতে গিয়ে কেন যেন মন সরে না, হাত নড়ে না। সেদিন এক অনলাইনে মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর এক সমর্থকের লেখা পড়লাম। আমাকে অনেক তাচ্ছিল্যের পরও তিনি একটি সত্য কথা বলেছেন, হাসানুল হক ইনু স্বাধীনতার পর যত মানুষ মেরেছে, পাকিস্তান হানাদাররাও তত মানুষ মারে নাই বা মারতে পারে নাই। পাকিস্তান হানাদাররা যত মানুষ মেরেছে হাসানুল হক ইনু কেন, তার মতো ১০০ জন একত্র হয়েও অত মানুষ মারতে পারতেন না। কিন্তু কদিন থেকে সে কথাই বলা হচ্ছে যা আমার কথা নয়। মফস্বলের সাংবাদিকরা কখনো কখনো আমাদের কথা ধরতে না পেরে তাদের মতো করে লিখে দেন। যা নিয়ে অনেক সময় বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। হাসানুল হক ইনুর গণবাহিনী যত মানুষ মেরেছে পাকিস্তানি হানাদাররাও তত মানুষ মারতে পারে নাই ওটা আমার কথা নয়, ও কথা সাংবাদিকদের। আমার কথা ছিল, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদাররা যত মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করেছে, হাসানুল হক ইনুর গণবাহিনী এবং সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি তার চেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের লোকজন হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ-জামালপুর-শেরপুর-সিরাজগঞ্জ-পাবনা-মানিকগঞ্জের যে এলাকা মুক্ত ছিল সেখানে হাজার পঁচিশেক সাধারণ মানুষকে হানাদাররা হত্যা এবং ৪-৫ হাজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করেছে। আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছে অনেক, কিন্তু হাঁস-মুরগির মতো মারতে পারেনি। ১২ জুন কালিহাতীর বল্লায় প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল। হানাদারদের ১৫-২০ জন নিহত ও ২৫-৩০ জন আহত হয়েছিল। আমাদের কারও গায়ে ফুলের টোকাও লাগেনি। ১৯ এপ্রিল কালিহাতীতে ভীষণ যুদ্ধ হয়েছিল। সেখানে আমাদের ১০-১২ জন শহীদ হয়েছিল। একেবারে প্রথম ৩ এপ্রিল সাটিয়াচরায় হানাদারদের টাঙ্গাইল প্রবেশের মুখে বাধা দিয়েছিলাম। সেখানে ৮-৯ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয় এবং প্রায় ২০০ গ্রামবাসীকে তারা হত্যা করে। ১১ আগস্ট মেজর হাবিবের নেতৃত্বে জাহাজমারার যুদ্ধ, যেখানে ৩০ জন হানাদার নিহত হয়েছিল, একজন মুক্তিযোদ্ধার পায়ে গুলি লেগেছিল। মাকরাই-ধলাপাড়া-দেওপাড়া-পাথরঘাটা-রাঙামাটি-কামুটিয়া। ২১ নভেম্বর পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ঢাকা-টাঙ্গাইল রাস্তায় কালিয়াকৈরের মহিষবাথান থেকে ময়মনসিংহের মধুপুর, টাঙ্গাইল থেকে নাগরপুর, এলেঙ্গা থেকে ভুয়াপুর ৪২টি সড়ক সেতু কালভার্ট উড়িয়ে দিয়েছিলাম। ১০-১২ জন আহত, তিনজন নিহত হয়েছিল। একেবারে সর্বশেষ নাগরপুর থানা দখল ৩০ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর ৫ হাজার যোদ্ধা নিয়ে তিন দিনের ভীষণ যুদ্ধে আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী, হুমায়ুন বাঙ্গাল আর শামসু গুরুতর আহত হয়েছিল। কেউ শহীদ হয়নি। ৬ ডিসেম্বর গভীর রাতে ভারত স্বীকৃতি দিলে প্রায় ৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিকরাইলে সমবেত হয়। সেখান থেকে একদল দক্ষিণ থেকে জামালপুরের দিকে আক্রমণ করে। অন্যান্য দল গোপালপুর-ঘাটাইল-কালিহাতীসহ টাঙ্গাইল মুক্ত করার অভিযানে শরিক হয়। ছত্রীবাহিনী নিরাপদে অবতরণ এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের সময় দিতে পাকিস্তানিদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য কালিহাতী থেকে পুংলীর হানাদারদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। সেখানেও আমাদের তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল হানাদারমুক্ত করার অভিযানে পশ্চিম দিক থেকে ক্যাপ্টেন নিয়ত আলী, ড. আবদুর রাজ্জাক, কমান্ডার আলমগীর; দক্ষিণ দিকে বায়েজিদ আলম, ভিপি শামসু, মতি, সাইদুর; পুব দিকে ব্রি. ফজলু, মোকাদ্দেছ আলী, মেজর লোকমান, ক্যাপ্টেন মোস্তফা; উত্তর থেকে হাকিম, সবুর খান, আমান উল্লাহ, আনিস, ফজলু টাঙ্গাইলের টুঁটি চেপে ধরেছিল। সেই অভিযানে কাদেরিয়া বাহিনীর ১৫-২০ জন আহত, ৩ জন শহীদ হয়েছিল। জাহাজমারা কমান্ডার হাবিব ও ব্রাহ্মণশাসনের চান মিয়াকে কালিদাসপাড়ায় ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইলের পথ আগলে রাখার দায়িত্ব দিয়ে মোগলাপাড়া থেকে যখন টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহের রাস্তা ধরেছিলাম তখন ৩-৪ হাজার যোদ্ধা আগে পিছে এবং রাস্তার দুই পাশে প্রায় দুই মাইল চিরুনি অভিযান চালাতে চালাতে এগিয়ে চলেছিল। সারা দিনে প্রায় ২০ মাইল এগোতে গিয়ে প্রথম শোলাকুড়ায় বাধা পাই। মেশিনগান, আরআরের প্রচণ্ড গুলি এলেও আমাদের কেউ হতাহত হয়নি। টাঙ্গাইল থেকে ঢাকার পথে ১৩ ডিসেম্বর গোড়াইর কাছে রাস্তার পাশ থেকে আচমকা গুলিতে ২ জন ভারতীয় এবং ৪ জন কাদেরিয়া বাহিনীর নিহত ও ৬-৭ জন আহত হয়। কড্ডার দিক থেকে মিত্রবাহিনীর যে দল এগোচ্ছিল তিন দিনে তাদের ৩ জন ছত্রীসেনা এবং কাদেরিয়া বাহিনীর ২ জন শহীদ ও ১৬-১৭ জন আহত হয়। অন্যদিকে নবীনগরে ব্রি. সানসিংয়ের ব্রিগেড সাভার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি ১৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে প্রচণ্ড বাধা পায়। সেখানে সর্বশেষ মারাত্মক যুদ্ধ হয়। যে যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ১৫-১৬ জন হতাহত হয়। প্রায় ৩০০ জন হানাদার নিহত হওয়ার পর ৯০ জন আত্মসমর্পণ করে, শতেক-দেড় শ পালিয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর হেমায়েতপুর পুলের ওপর থেকে আমরা যে দূত পাঠিয়েছিলাম ৩ জন ভারতীয়, ১ জন কাদেরিয়া বাহিনী। টাইগার নিয়াজি আত্মসমর্পণ করবে এই খবরের আনন্দে তারা জ্ঞানহারা হয়ে রকেট গতিতে ফিরে আসছিল। তাদের গাড়িতে ঝোলানো সাদা শার্ট তীব্রগতির জন্য উড়ে গিয়েছিল। তাই আমাদের সৈন্যরা শত্রুসৈন্য মনে করে গুলি চালিয়েছিল। তাতে ৩ জন শহীদ এবং ১ জন গুরুতর আহত হয়েছিল। এরপর কারও প্রাণও যায়নি, কেউ আঘাতও পায়নি। সেজন্য বলেছি, পাকিস্তান হানাদাররা নিরপরাধ মানুষের ওপর যত বীরত্বই দেখাক মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর তেমন কিছু করতে পারেনি। ভারতীয় মিত্রবাহিনী আমাদের সাথী হলে লেজ গুটিয়ে পালানো ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না। তাই বলেছিলাম, হাসানুল হক ইনুর গণবাহিনী স্বাধীন বাংলাদেশে গুনে গুনে যত মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী হত্যা করেছে হানাদাররাও তা করতে পারেনি।

 



যা হোক, সমালোচক থাকবেই। নিখাদ সত্য সমালোচনা ইবাদতের মতো। যে সমালোচককে সম্মান করে না, তার চেয়ে নির্বোধ দুনিয়ায় কেউ নেই। তাই সমালোচনা সহ্য করার মতো পিঠের চামড়া অনেক আগেই পুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগ সরকার থেকে যখন শুধুই বঙ্গবন্ধুর কথা আসে তখন ভালো লাগে না। নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের মাথার মণি, আমরা ছিলাম তার ছায়া। কিন্তু আমরাও তো ছিলাম।



 

NEXT >