close


(বাংলাদেশ প্রতিদিন)

 প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ টা আপলোড : ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ২৩:২৩

 

 

আড়ম্বরপূর্ণ ভারতীয় প্রজাতন্ত্র দিবস

 

- বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

 

 

এমন লেখা খুব একটা লিখিনি। শুরু বাবর রোডের বাসা থেকে, শেষ ত্রিশালের নজরুল একাডেমি ভবনে। সংশোধন করেছিলাম সখীপুরে দীপ-কুঁড়ি-কুশি কুটিরে। ভেবেছিলাম, টাঙ্গাইল গিয়ে লেখাটি পাঠিয়ে দেব। নলুয়া-বেড়বাড়ীর কাছাকাছি হঠাৎ দীপের আম্মুর ফোন, অভাবনীয় কান্নাজড়িত গলা। স্ত্রীর অমন গলা শুনেছিলাম বাবার মৃত্যু খবর দিতে এক গভীর রাতে। আবার ঠিক সেই একই রকম কান্না, ‘জানো, এইমাত্র দুলাভাই মারা গেছেন।’ শেরপুর-নখলার বাছুর আগলার এ কে এম শহীদুল হক ছিলেন আমার স্ত্রীর পরিবারে পিতার মতো। আমার বিয়েতেও নাসরীনের বড় ভাই ফারুক কোরায়েশী ও শহীদুল হক বর্ধমানে গিয়েছিলেন। হঠাৎ তার মৃতুসংবাদ পেয়ে মনটা খুবই ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। মানুষ মরণশীল। সবাই মরবে। কিন্তু আচমকা মৃত্যুসংবাদ মানুষকে বড় নাড়া দেয়। সকালে ভালোভাবে নাস্তা করে কাপড়-চোপড় পরে তিনি শহরে বেরিয়েছিলেন। নিয়মিত ক্লাবে আড্ডা দেওয়া ছিল তার স্বভাব। ক্লাবেই একসময় পড়ে যান। সেখান থেকে হাসপাতালে নিলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা দেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন তাকে বেহেশতবাসী করেন।

 



গত শুক্রবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় গিয়েছিলাম। যেহেতু সব সামর্থ্যবানের কারবার, সেহেতু অতিথির চেয়ে গাড়ির সংখ্যা বেশি ছিল। মনে হচ্ছিল সারা দেশ ভেঙে পড়েছে। গাড়ির লম্বা লাইন, অনেক দূর ঘুরে কনভেনশন সিটিতে ঢুকতে হয়েছিল। ২ নম্বর হল, রাস্তা থেকে অনেকটা দূর। পুরোটাই দু-তিন সারিতে গাড়ি ছিল। বড় ধীরগতিতে গাড়ি এগোচ্ছিল। পশ্চিমে গিয়ে পুব দিকে এসে গাড়ি থেকে অতিথিরা নামছিলেন। অনেক দূর থেকে লাঠি হাতে ড. কামাল হোসেনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। একটা লোকও ছিল না তার আশপাশে। আমি খুবই অস্বস্তিবোধ করছিলাম। দূর থেকে মনে মনে স্থির করেছিলাম তার গাড়ি আসতে অবশ্যই দেরি হচ্ছে। বয়সী মানুষ, কতক্ষণ না কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন, অন্তত তার গাড়ি পর্যন্ত আমার গাড়ি দিয়ে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। গাড়ি থেকে নেমে তার হাত ধরতেই আমার বলার আগেই তিনি বললেন, ‘অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। আপনার গাড়ি করে একটু এগিয়ে দেন তো।’ বড় ভালো লেগেছিল তার কথায়। ড. কামাল হোসেন সবসময় নিচু গাড়িতে চড়েন। আমার জিপ খুব উঁচু, তার খুব অসুবিধা হচ্ছিল। অনেক কষ্টে তাকে গাড়িতে তুলেছিলাম। গাড়িতে উঠতেই যখন বললাম, ‘স্যার! আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসুক।’ তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘ঠিক আছে তাই হোক।’ হলে মেটাল ডিটেক্টরের ভিতর দিয়ে যেতে হয়। যাওয়ার পথে কেউ একজন বললেন, কার্ড দেখি। আমার আবার কার্ড দেখানোর খুব একটা স্বভাব নেই। তাও আবার নিজের দেশে। তবু একটি বন্ধুপ্রতিম দেশের প্রজাতন্ত্র দিবস, তাই পকেট থেকে কার্ড বের করেছিলাম। ১০-১২ বছর আগে কার্ড ছাড়া যাওয়ায় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে গেটে ঢুকতে দিচ্ছিল না। বড় মর্মাহত হয়েছিলাম। যদিও তখন বীণা সিক্রি ছিলেন হাইকমিশনার। ভিতরে গিয়ে বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটে এসে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবার আমি আমার ক্যামেরা নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাবসাব দেখে ক্যামেরার কথা আর বলিনি। সামনেই হাইকমিশনার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি আমাকে ভালো করে চেনেন কিনা জানি না। একে তো মুক্তিযুদ্ধের সময় ছোট ছিলেন, তারপর আমি যখন নির্বাসনে দার্জিলিংয়ে কয়েকবার গেছি তখন কোথায় ছিলেন ভালো করে জানি না। এর মাঝে কয়েকবার দেখা হয়েছে। খুব সম্ভবত গতবার সোনারগাঁওয়ে। এক-দুবার সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সফরে। তবে তেমন আলাপ-আলোচনা হয়নি। হলের ভিতরে বসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সবাই দাঁড়িয়ে। অল্প বয়সীদের হয়তো তেমন কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু অনেক বয়সীদের সত্যিই অসুবিধা ছিল। যাওয়ার আগে নঈম নিজামকে বিমানবন্দর থেকে ফোন করেছিলাম। ছোট ভাই মোশারফ হোসেন মন্নু ১৮ বছর পর আমেরিকা থেকে দেশে এসেছিল। সে, তার স্ত্রী নাসিম মোশারফ, নাসিমের ভাই ১০-১৫ দিন দেশে কাটিয়ে চলে গেল। তাদের প্লেনে তুলে দিতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম। বিমানবন্দরে খুব যত্ন করেছে। অফিসারদের বা ক্ষমতাসীনদের যেভাবে যত্ন করে আমাকে মনে হয় সেভাবে করে না। অনেকে মনের দিক থেকে ভালোবেসেই করে। নঈম নিজাম বলছিল, রাস্তায় খুবই যানজট। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে সত্যিই ঢাকার দিকে প্রচণ্ড যানজট দেখেছিলাম। কিন্তু ৩০-৪০ মিনিট পর যখন বসুন্ধরা কনভেনশন সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েছিলাম তখন কোনো যানজট ছিল না। কত আর হবে ১০-১৫ মিনিটেই বসুন্ধরা কনভেনশন সিটির সামনের রাস্তায় এসে গিয়েছিলাম। বরং মূল রাস্তা থেকে হলের দরজা পর্যন্ত পৌঁছতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছিল। হলে ঢুকে দেখি সারা ঘর গমগম করছে। কত রংবেরঙের মানুষ। ততক্ষণে হাইকমিশনার গিয়ে মঞ্চে উঠেছিলেন। সঙ্গে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। হলের মধ্যে যেতে যেতেই ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ ও ‘জনগণমন ভারত ভাগ্য বিধাতা জয় হে’ দুই দেশের জাতীয় সংগীত গাওয়া এবং ভারতের মান্যবর হাইকমিশনারের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বাংলাদেশের, ভারতের জাতীয় সংগীতের সময় উভয় দেশের জাতীয় পতাকা পর্দায় বড় চমৎকার দেখাচ্ছিল। প্রথমে মান্যবর ভারতীয় হাইকমিশনার, পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রজাতন্ত্র দিবসে বক্তব্য দেন। অনেকেই পেট পুরে খাওয়া-দাওয়া করছিলেন। কেউ কেউ কথাবার্তা বলছিলেন। আমি চিন্তায় ছিলাম এত দূর থেকে বাড়ি ফিরব কী করে। বড় লোকের জায়গায় গরিবের গাড়ি সিএনজি পাওয়া যাবে কিনা কে জানে? কারণ আমি খুব একটা বাইরের গাড়িতে চড়ি না। ভালো থাকুক খারাপ থাকুক নিজের গাড়িতেই চলাচল করি। দু-তিন জনকে বলেছিলাম ড. কামাল হোসেনকে গাড়ি দিয়ে দিয়েছি, এখন বাড়ি যাব কী করে? কিন্তু কারও মধ্যে কোনো আকার-বিকার দেখিনি। ৮-১০ জন তো হবেই, যাদের আমার অসুবিধা জানিয়েছিলাম কিন্তু কারও মধ্যে কোনো উৎসাহ দেখিনি।

অথচ সবাই গাড়ি করে এসেছেন। ও রকম গাড়ি ছাড়া ঘটনা গত বছর ১৫ আগস্ট ঘটেছিল। ছেলেমেয়ে, বউসহ আমি ৩২ নম্বর গেলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বোন রেহানার সঙ্গে দেখা হয়। এসএসএফ আমার গাড়ি কোথায় পাঠিয়ে দিয়েছিল ৩২ নম্বর থেকে বেরিয়ে হদিস পাচ্ছিলাম না। হেঁটে সোবহানবাগ মসজিদ পর্যন্ত এসেছিলাম। ড্রাইভারকে ফোন করে পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ তার কাছে ফোন ছিল না। ঠিক সে সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাবেক সহকারী অ্যাডভোকেট কাউসারকে যেতে দেখি। হাত তুলে ডাক দিতেই গাড়ি থেকে নেমে ছুটে এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। মাথা তুলেই জিজ্ঞাসা করে, ‘লিডার! কী করতে হবে?’ একটা মাইক্রোবাসে ও একাই ছিল। বললাম, গাড়ি পাচ্ছি না। আমরা ছয়-সাত জন। সবাইকে তুলে বাবর রোডের বাসায় পৌঁছে দিয়ে মিষ্টি খেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় প্রজাতন্ত্র দিবসে অতিথিদের কারও মধ্যে সামান্য সাহায্যের মানসিকতা দেখছিলাম না। মনে হয় ওই অবস্থায় আমার মাথা ঠিক কাজ করছিল না। যাই হোক বন্ধুবান্ধব-হিতৈষী এখনো খুব একটা কম নেই। তবু কারও কথা মনে পড়ছিল না। বাড়িতে বেগমকে ফোন করেছিলাম। ছোট মেয়ে কুশি ধরেছিল। আম্মুকে দাও বলতেই সে ফোনটা মাকে ধরিয়ে দেয়। আমি কথা বললে বেগম বার বার বলছিল, ‘কে বলছেন?’ আমি যতই বলি দীপের বাবা সে আমায় চিনতে পারেনি। দু-এক বার মনে করেছেন কিশোরগঞ্জের দীপের বাবা কিনা। যাই হোক, হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে আঁতকে আমার ফোন বুঝতে পারছিল না। পরে বোঝাপড়া হলে বলেছিলাম, কামাল ভাইকে গাড়ি দিয়ে দিয়েছি। দেখো তো গাড়ি পাঠাতে পারো কিনা? বসুন্ধরা কনভেনশন সিটিতে আছি। বড় মেয়ে কুঁড়ি ১০-১২ দিন হবে লন্ডন থেকে এসেছে। সে গুলশান ২ নম্বরে তার কোনো বান্ধবীর বাড়ি গিয়েছিল। ফোন করতেই ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে গাড়ি হাজির।
 

NEXT >