close


(পূর্বপশ্চি)

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৮:১২ | আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৮:১৫

 

 

এখন কেনো কাদের সিদ্দিকীকে দেখতে হাসপাতালে তাদের লাইন ?

- মেহেদী সম্রাট

 

 

গতকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলাম বাংলার এই বীর সন্তানকে দেখতে। অনেকদিন পর টানা ৬/৭ ঘন্টা তার কাছাকাছি ছিলাম। অনেক খারাপ সময়ে, বিপদসংকুল মুহূর্তে তাকে দেখেছি কোনদিন এই মানুষটি বিচলিত হননি। বীরদর্পে সকল কিছু মোকাবেলা করেছেন। ১৯৭১, ১৯৭৫, ৭৫ এর পর থেকে ১৯৯০ এবং এখন পর্যন্ত অনেক প্রতিকুল সময় তিনি পেরিয়ে এসেছন। নিঃসার্থ ভাবে নির্মোহ ভাবে শুধু দিয়েই গেছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য, বঙ্গবন্ধুর জন্য। নিজেকে নিয়ে ভাবেননি কখনো। নিজের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব করেননি কোনও দিনও। সারাটা জীবনই তিনি অন্যায় ও অনৈতিকতার সাথে আপোষহীন।

আমরা এই মানুষটিকে, এই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে, এই ঐতিহাসিক গেরিলা কমান্ডারকে, একমাত্র বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে বীরউত্তম খেতাবধারী লোকটিকে কিছুই দিতে পারিনি। আমরা কি জাতি হিসেবে এতটাই রিক্ত ছিলাম? তাকে দেওয়ার মতো কি কিছুই ছিলো না আমাদের?

হ্যাঁ দিয়েছি। অপমান-অসম্মানের গ্লানি তাকে দিয়েছি। তাকে 'নব্য-রাজাকার' বলে মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করেছি। ভোট ডাকাতি করে তাকে সংসদের বাইরে রেখেছি। তবে কোন কিছুই এই লৌহ মানব কে টলাতে পারেনি। এই বৃদ্ধ বয়সেও মানুষটি শহর থেকে মফস্বলে, গ্রাম-গঞ্জে-গ্রামান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন। তৃণমূল মানুষের ভাগ্যন্নয়নের কথা ভেবেছেন। মুক্তিযোদ্ধা এবং ১৯৭৫ এর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সংগ্রাম করেছেন। নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে লড়ছেন। ক্ষমতার মোহ, সম্পদের হাতছানি কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারিত্বের প্রলোভন তাকে বিন্দুমাত্রও স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি সরকারি প্রোটকল নিয়ে আরাম কেদারায় বসে নয় বরং বরাবর রাজপথে দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলেছেন, দাবি তুলেছেন, সংগ্রাম করেছেন।

হ্যাঁ সেই রাজপথের কাদের সিদ্দিকী আজ অসুস্থ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের কেবিন ব্লকের ৬ষ্ঠ তলায় ৬১২ নম্বর কেবিনে শুয়ে আছেন তিনি। সেখানেও কি এতটুকু শান্তিতে তিনি আছেন? তাঁর জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে তাকে নিয়ে শুরু হয়েছে টানাহেঁচড়া। কিন্তু কেনো? কেনো এতগুলো বছর পর?

এখন তাঁকে দেখতে হাসপাতালে প্রেসিডিয়াম মেম্বার, স্টান্ডিং কমিটির মেম্বারদের লাইন পড়ে। মহাসচিব, সাধারণ সম্পাদকরা তাঁকে দেখতে যাবার নাম করে মিডিয়া পলিটিক্স করেন। মিনিস্টারগণ পালা করে তাঁকে দেখতে যান। সাংবাদিক, কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবি, চ্যানেলের মালিক, টকশো ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্মকর্তা এ ছাড়াও আরো নানান পেশার মানুষ এখন লাইন দিয়ে বঙ্গবীরকে দেখতে হাসপাতালে ছুটছেন প্রতিদিন। প্রশ্ন হলো কিন্তু এতদিন এরা কোথায় ছিলেন? এর আগেওতো বঙ্গবীর একবার সাবেক পিজিতে এবং একবার ঢামেক এ ভর্তি ছিলেন। তখনতো এতটা পিঁপড়ের লাইন দেখিনি! তাহলে এখন কেনো? যারা পিছনে তাকে গালাগাল দিতেন তাদেরকেও তো দেখছি চ্যানেলের ক্যামেরা পাঠিয়ে হাসপাতালে কাদের সিদ্দিকীর কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে! এসবের কারণ খুঁজতে হলে খুববেশি কি ভাবতে হবে?

তবে আমরা যারা বঙ্গবীরকে ভালোবাসি তারা অন্তর থেকে চাই জীবনের শেষ সময়ে তিনি যেন কারো ক্ষমতায় যাবার সিঁড়ি না হন। যে ক'টি বছর আর বাঁচবেন, তিনি যেন রাজপথে দাঁড়িয়ে অন্যায় অনৈতিকতার বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতেই বাঁচেন। কাদের সিদ্দিকী নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান, একজন বিপ্লবী, আমৃত্যু একজন লড়াকু বীর। শত শত বছর ধরে তাঁর বিপ্লবী আদর্শ বেঁচে থাকবে সহস্র তরুণের হৃদয়ের মণিকোঠায়। প্রতিবাদে, সমরে, বিপ্লবে তিনি হবেন তরুণের প্রেরণা। মিছিলের অগ্রভাগে ছুটে চলা যুবকের চেতনায় থাকবে কাদের সিদ্দিকীর বিপ্লবী জীবনের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস।

দোয়া করি পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক। ফিরে আসুকে রাজপথে। ঘোর অমানিশার হাতছানিতে আচ্ছন্ন দেশের মানুষ। এসময়ে একজন কাদের সিদ্দিকীকে খুব প্রয়োজন জনতার। রাজপথ কিংবা সংসদ সবখানেই জোর গলায় জনতার পক্ষপাতিত্ব করার জন্য বঙ্গবীরকে তো ফিরে আসতেই হবে!

লেখক: গল্পকার ও সাংবাদিক।